![]() |
| দার্জিলিং |
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি শহর হল দার্জিলিং। এই দার্জিলিং শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত। কাছাকাছি রয়েছে বিশ্বের তৃতীয় পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য। এছাড়াও বিভিন্ন পর্য়টনস্পটে এর জন্য দার্জিলিং বিখ্যাত। আজ আমাদরে অভিযান দার্জিলিংকে নিয়ে।
উচ্চতা ৭ হাজার ফুট, কোথাও ৮ কিংবা ৯ হাজার ফুট, আবার কোথাও ১২ হাজর ফুটের কাছাকাছি। আকাশের এত কাছাকাছি থাকলে বজ্রপাত ত হবেই। আর এই বেশি বজ্রপাত থেকে যায়গাটার নামকরন। তিব্বতি ভাষায় ধর্ঝি মানে বজ্রপাত, লিংখ মানে যায়গা । আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি দার্জিলিং এ। দার্জিলিং আকাশের কাছাকাছি বলেই দৃষ্টি সীমায় ধরা দে বহুদূরের কাঞ্চনজঙ্ঘা। বরফে ছেয়ে যাওয়া পাহাড়ের চুঁড়া গুলো দিনের বেশিরভাগ সময় থাকে মেঘের আড়ালে। সত্যজিৎ রায়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা চলচিত্রের মত পর্যটকদের কেউ কেউ তুষারশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পায় আবার কেউ পায় না।
![]() |
| কাঞ্চনজঙ্ঘা |
আবাহাওয়ার কারনে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা না ফেলেও ক্ষতি নেই, পাহাড়ের এই রাজ্যপাটে চোখ জুড়ানোর উপাদান কি কম! চোখ জুড়ানো নিসর্গের রং,রূপ,মাধুরী দেখতে কেউ কেউ প্যারাস্যূট নিয়ে উড়াল দে শূণ্যে, মন মাতানো দৃশ্য গুলা আরও কাছ থেকে দেখতে। কাঞ্চনজঙ্ঘাই হোক কিংবা প্যারাস্যূটে অবজারবেশান হিল প্রকৃতি উপভোগের দারুন যায়গা। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সম্পূর্ণ রূপ দারুন ভাবে দেখা যায়।
এখানে রয়ছে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এর স্মৃতিবিজড়িত অপরূপ সুন্দর দোতালা বাড়ি। অসুস্থ দেশ বন্ধু চিকিৎসকের পরামর্শে হাওয়া বদলের জন্য বন্ধু এনিক সরকারের এই বাড়িতে সপরিবারে এসেছেন ১৯২৫ সালের মে মাসে। দোতালার কক্ষগুলাতে দেশবন্ধুর ব্যবহার করা আসবাবপত্র গুলো এখনো সাজানো রয়েছে আগের মতাই। অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও দেশবন্ধু রাজনীতি ছেড়ে দেন নাই। মাহাত্মা গান্ধী সহ বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা করতেন সবসময়।
ভাল পরিবেশ, নিয়ম মেনে জীবন যাপন, স্বাস্থ্যকর খাবার,চিকিৎসকের পরামর্শ সবমিলিয়ে সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন দেশবন্ধু চিত্ররঞ্জন দাশ। কিন্তু হঠাৎ করে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন জুন মাসে। এর পর আর ফিরে আসতে পারেন নাই। জীবনাবসান হয় দেশবন্ধুর। জুন মাসের চার তারিখে দেশবন্ধুর সাথে দেখা করতে এসে মাহাত্মা গান্ধী দার্জিলিং এর এ বাড়িতে ছিলেন ৯ তারিখ পর্যন্ত। প্রকৃতি ধন্য স্বস্থ্যকর স্থান হওয়ায়
স্বাস্থ্যপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য দার্জিলিং হচ্ছে সবচেয়ে প্রিয় যায়গা যুগ যুগ ধরে। সেই দার্জিলিং প্রেমীদের ঠাঁই দেওয়ার জন্য হোটেল, কটেজ, গেস্ট হাউজও কম নয় এই পাহাড়ি জনপদে। কিছু কিছু গেস্ট হাউজ সাজানো গোছানো ছবির মত সুন্দর। এখানকার আতিথেয়তা ধোঁয়া উঠ দার্জিলিং চা আর চোখের সামনে যেন শিল্পীর আঁকা দারুন সব দৃশ্য সবার মন কাড়বেই। দার্জিলিং শহরের ৭৭ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঝে স্কুল গুলোর খ্যাতি বিশ্বজুড়ে।
এখানকার একটি স্কুল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭ হাজর ৮০০ ফুট উপরে, এমন স্কুল পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এখানে রয়েছে একটি বিখ্যাত প্রাচীন সেইন্ট ফলস স্কুল। ১৮২৩ সালে তৈরি এশিয়ার প্রাচীন এই স্কুলটি কড়া নিয়মকানুনের বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পেয়েছে। স্কুলের সামনে রইয়ে সেই সেন্ট ফলস এর ভাস্কার্য়, যার নামে এই স্কুলটির নামকরন করা হয়েছে। এই স্কুলের প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেনীর শিক্ষার্থীরা প্রাইামারী, জুনিয়র ও সিনিয়র এই তিন ভাগে ভিবক্ত। প্রতিটি বিভাগ পরিচালিত হয় স্বাধীনভাবে। স্কুলের চ্যাপলে জাতি,ধর্ম নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থী প্রতিদিন অংশ নেয় সার্বজনীন প্রার্থনায় এবং উদ্ভদ্ধ হয় মৈত্রী ও মানবতার আদর্শে। খেলাধুলা সবার জন্য বাধ্যতামূলক এই স্কলে। প্রার্থনায়, প্রতিযোগিতার পাঙ্গনে এবং পাঠদানে এই স্কলটি দার্জিলিং সংস্কৃতির ধারক বাহক।
এখানে আছে বিখ্যাত পদ্মাজা নাইডু হিমালয়ান জুওলজিক্যাল পার্ক। বছরে ৩ লাখের বেশি পর্যটক আসে এই পার্কে। দার্জিলিং এলে আপনিও ঘুরে যেতে পারেন। পার্কের আয়তন ৪৪ হেক্টর যায়গা জুড়ে হলেও এর অবস্থান সমুদ্রপিষ্ঠ থেকে প্রায় ৭ হাজার ফুট উপরে, উপরে থাকা অভ্যস্ত প্রানীর গুলারই অবস্থান এখানে। এই জুলজিক্যাল পর্কের মূল লক্ষ্য বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় প্রানীসহ হিমালয় এলাকার প্রানী বৈচিত্র পর্যবেক্ষন, অধ্যয়ন ও সংরক্ষন। পান্ডা দেখেতে শুধু শুধু চীন জাপানে যাবেন কেন, এখানে ত আছে! হিমালয় এলাকার এই পান্ডা বাঁশখেকো আর খুব ঘুমকাতুরে। এছাড়াও পার্কের ভিতর রছেছে বিভিন্ন প্রজাতির হনুমান। লতা পাতা সহ গাছের প্রায় সবকিছুই খায় হনুমান। খাওয়া শেষ হলেই ঘুম। পার্কে রয়ছে কিছু হিমালয়ের পাহাড়ি ছাগল। স্থানীয় নাম গোরাল।
![]() |
| পদ্মাজা নাইডু হিমালয়ান জুওলজিক্যাল পার্ক |
বিভিন্ন ধরনের পশু পাখি দিয়ে ভরপুর হিমালয়ের এই জুওলজিক্যাল পার্ক। ১৯৫৮ সালে এই পার্কটি একটি পাহাড়ের ঢালে দার্জিলিং শহর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে গড়ে উঠেছে। পার্কটির ভিতরে রয়েছে বিলুপ্ত কিছু নেকড়ে। আছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ল্যাপাড়, স্নো ল্যাপাড় বিলুপ্তপ্রায় এসব প্রানী।
জুওলজিক্যাল পার্কের পাঠ চুকিয়ে সামনে এগুলে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জহরলাল নেহেরুর গড়া মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট। হিমালয়ের দুর্গম শিখরে পর্বাতারোহীদের উঠতে হয় বিশেষ কায়দা কৌশলে। পাহাড়ে উঠার এসব কায়দা কৌশলই শিখানো হয় হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে। বিগত ৫০ বছরে প্রায় ২৫ হাজার দেশি বিদেশি পর্বতারহনের কঠিন সব কায়দা কৌশল শিখেছেন এখানে। এখানে এলে মাউন্টেনিয়ারিং মিউজিয়ামেও যেতে ভুলবেন না।
দার্জিলিং এর আয়তন ৩১৪৯ বর্গ কিলোমিটার। পার্বত্য এই জনপদে জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজারের মত। স্থানীয় বাসিন্দারা কেউ থাকে শহরতলীতে কেউবা আশেপাশের গ্রামে। গ্রামীন জীবন দেখতে হলে শহর থেকে আসতে হবে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে। গ্রামের ভিতর পাহাড়ি ঢাল বেয়ে দীর্ঘ রাস্তা। রাস্তার দু পাশে পুস্পসজ্জিত ঘর বাড়ি। এখানে বেশিরভাগ বাড়ির বাসিন্দা নেপালি নৃগোষ্ঠির সদস্য। প্রতিটি বাড়ির সামনে রকমারি ফুরের বাহার।
এগুলা যেন বাড়ি নয়, একেকটি ফুলের নার্সারি। প্রায় ৪ হাজার প্রজাতির ফুল নাকি ফুটে এই দার্জিলিং এ। এই গ্রামের বাসিন্দারা শুধু ফুল পাগল না নাচগানেরও ভক্ত খুব। বেড়াতে এসে আমরা সাধারনত ঘুরি জনপ্রিয় টুরিস্টস্পর্ট গুলাতে, পা রাখি না প্রান্তিক জীবনের আঙ্গিনায়। এখানে এসেই দেখুন বৈচিত্রের রঙ্গে রঙ্গিন হবে আপনার মন। পহাড়িরা প্রকৃতির মতই সরল। প্রিয় ভিউয়ার আজ আর নয়। ঘুরে বেড়ানোর উচ্ছ্বাস ঘিরে থাকুক আপনার আপন আঙ্গিনায়।




0 Comments