সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি কক্সবাজার

কক্সবাজার

জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি , মোটামুটি শীত ভালই পড়তেছে। বন্ধুরা এবং কয়েকটা বড় ভাই সহ সিদ্ধান্ত নিলাম কক্সবাজার ভ্রমনে যাবো।বছরের প্রথম মাস, সবাই মোটামুটি ফ্রী আছে। অফিসে তেমন কাজ না থাকায় সবাই যেতে রাজী হয়ে গেলো। এ মাসে অফিসে তেমন একটা কাজ থাকে না। 


কক্সবাজার যাওয়ার দিনক্ষন ঠিক করে ফেললাম, জানুয়ারী মাসের ১৫ তারিখ। আমরা পাঁচ  জন ছিলাম তুহিন,আসিফ,শাহদাত,নোমান আর আমি। এদিকে সবাই গোছগাছ করতে লাগলাম আর কিছু টুকটাক মার্কেট থেকে কিনে নিলাম, কিছু বাকি থাকলে ওগুলা কক্সবাজার থেকে নেওয়া যাবে। 

কক্সবাজার মোটামুটি সব পচন্দের জিনিসই পাওয়া যায়। আজ জানুয়ারি মাসের তের তারিখ, যেন দিনই কাটতে চায় না। ১৫ তারিখ আসতে এখনো ১ দিন বাকি। সবাই মোটামুটি প্রস্তুত। আজ ১৫ তারিখের সকাল। আমাদের বাস সন্ধ্যা ৭ টায়। আমাদের গন্তব্য ঢাকা টু কক্সবাজার।

ঢাকাতে জ্যাম এর একটা ভয় থাকে তাই সবাই একটু আগেই বের হয়ছে কাউন্টারের উদ্দেশ্যে। আমারা এক এক করে ৫ জন চলে আসলাম ৬ টা ২০ মিনিটের মধ্যে।টিকিট আমারা আগেই বুক করে রেখেছিলাম। এখন পর্যটক ঘুরতে যায় বিভিন্ন টুরিষ্ট পয়েন্টে তাই টিকিট আগে না কাটলে হয় না।

বলে রাখা ভাল এখানে বিভিন্ন ধরনের বাস সার্ভিস আছে । এসি , নন এসি। নন এসি বাস গুলা ঢাকা থেকে কক্সবাজার ৮০০/৯০০শ টাকার মত নিবে আর এসি গুলা আর একটু বেশি। আমরা নন এসি বাস এর টিকিট নিলাম। এমনিতে আরও  অনেক লোকাল বাস আছে ওগুলাতে আরও কম নিবে ভাড়া।

এদিন যেন শীত একটু বেশী পরতেছে, আমরা বাসে চেপে বসলাম। দীর্ঘ যাত্রা তাই গাড়িতে খাওয়ার জন্য কিছু শুকনো খাবার নিতে ভুললাম না। অবশেষে গাড়ি ছাড়লো গন্তব্য কক্সবাজার। এটাই আমাদের প্রথম কক্সবাজার ট্যুর তাই একটা অজানা আনন্দ ভর করছে আমাদের ভিতর।

বাসের মধ্যে কারো ঘুম আসছিলো না, সবাই খুব উত্তেজিত। মোটামুটি ১০ ঘন্টার জার্নি শেষে আমরা ভোর সাড়ে ৬ টায় কক্সবাজার নামলাম। রাস্তায় জ্যাম ছিল না তাই বলা যায় তাড়াতাড়িই পৌঁছাইছি।চারদিকে ঘন কুয়াশা কিছু ভাল করে দেখা যাচ্ছে না। সামনে কিছুদুর হেঁটে গেলাম এবং একটা খাওয়ার হোটেল আবিস্কার করলাম।

হোটেলে ঢুকে একটু ফ্রেশ হয়ে সবাই নাস্তার অর্ডার করলাম। বলে রাখা ভাল মোটামুটি এখানে কোনকিছুই সস্তা পাবেন না। নাস্তা সেরে কিছুক্ষন আমরা হোটেলে কাটালাম। আস্তে আস্তে পুবআকাশে সূর্য উঁকি দিচ্ছে।

খাওয়ার হোটেল টা থেকে সমুদ্র সৈকত দেখা যাচ্ছে। সাগরের পানির মনমুগ্ধকর আওয়াজ ভেসে আসতেছে। এদিন টিভিতে দেখছি,বইতে পড়ছি, মানুষের কাছে শুনেছি। আজ আমরা পৃথীবির সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকতের সামনে দাঁড়িয়ে।

কক্সবাজার সৈকত

কক্সবাজারের সৈকতের কথা এতদিন শুনে আসছি। বাস্তবে এটি আরও বেশি সুন্দর, মনোরম পরিবেশ।যে যার মত আমরা উপভোগ করতে লাগলাম। সূর্য যখন মাথার উপরে রোদ জলমল করতেছে শীতও কমে গেছে তখন আমরা বীচ এর পানিতে নামলাম। পানিতে নেমে একটা অচেনা অনুভূতি মনে প্রাণে দোলা দিয়ে গেল। দেখলাম অসংস্য স্পীডবোট, যা ভ্রমন পিপাসুদের নিয়ে সাগরের আরো গভীরে পাড়ি দিচ্ছে । আমরাও একটা বোট ভাড়া করলাম সাগরকে আরও কাছে থেকে দেখতে। 

১ ঘন্টার জন্য ভাড়া করলে খরচ পড়বে জনপ্রতি ১৫০/২০০ টাকার মত। বোটে উঠার পর আনন্দ দ্বিগুন হয়ে গেল। তারপরও প্রথম স্পীডবোটে উঠে সাগরের মাঝে যাওয়া একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি মনে হল।

এভাবে আনন্দ উত্তেজনায় প্রায় ২ ঘন্টা কাটালাম। দুপুর ৩ টার দিকে একটা হোটেলে ঢুকলাম দুপুরের খাওয়ার জন্য। হোটেলের সামনে দাঁড়াতে 

সামুদ্রিক মাছের একটা ঘ্রান পেলাম ,যা আরও ক্ষুধাটাকে বাড়িয়ে দিল। হোটেলে ঢুকে দেখলাম ভিবিন্ন ধরনের তরকারির আইটেম রয়েছে। দামও আলাদা আলাদ।

যতই সমুদ্রে এসে সামুদ্রিক মাছ খান না কেন দাম কিন্তু কম না। এখানে খাওয়ার ভিন্নি প্যাকেজ রয়েছে। জন প্রতি ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০/৬০০ টাকা পর্যন্ত।

বিভিন্ন ধরনের খাবার আইটেম রয়েছে মোটামুটি সাধারন হোটেল গুলাতে। আমরা খেলাম সামুদ্রিক মাছ আর ঐতিহ্যবাহী শুটকি ভর্তা দিয়ে। আহ! কি স্বাদ! খাওয়া শেষ হলে একটু রেষ্ট নিলাম,যখন বিকাল গড়ালো আমরা আবার বীচ এর দিকে রওয়া দিলাম পায়ে হেঁটে। বীচ এ হাঁটতে হাঁটতে দেখতে লাগলাম সাগরের অফার সৌন্দর্য।

হাতে স্মার্টফোন দিয়ে যে যার মত ছবি তুলতেছে। তাছাড়া বীচ এ অনেক প্রফেশনাল ক্যামেরাম্যান আছে চাইলে ওদের থেকেও ভাল ভাল ছবি তুলে নিতে পারেন। ডিএসএলআর এ তোলা প্রতি কপি ছবি ৩ থেকে ৫ টাকা করে নিবে।

সমুদ্র দেখতে দেখতে  নির্বাক হয়ে গেছিলাম, কত বড় সমুদ্র কত তার জলরাশি,কত সুন্দর এই পৃথীবি, কক্সবাজার না আসলে বুঝতামই না কক্সবাজারের মর্ম।  সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিতে ভুলি নি তার হাতে গড়া এই অপার সৌন্দর্য পৃথিবী তৈরি করার জন্য। হঠাৎ বন্ধুরা ডাকতে লাগলো, এতক্ষন প্রকৃতির ঘোরে অচেতন ছিলাম।

প্রায় ২/৩ ঘন্টা বীচে ঘুরে ঘুরে এর সুন্দর দৃশ্য গুলা উপভোগ করলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেল, এবার আমাদের গন্তব্য ঐতিহ্যবাহী বার্মিজ মার্কেটে। এতদিন মানুষের মুখে শুনেছি, ভিডিওতে দেখেছি বার্মিজ মার্কেট।  আজ আমরা ওখানেই যাচ্ছি, খুবই ভাল লাগতেছে আমাদের।

আমরা সবাই একটা টমটম ভাড়া করে মার্কেটের দিকে রওনা দিলাম। প্রায় ২০/২৫ মিনিট পর আমরা চলে আসলাম মার্কেটে। ড্রাইবারকে ভাড়া দিয়ে মার্কেটের ভেতরে ঢুকলাম। ভিতরে ঢুকে দেখলাম প্রতিটি দোকানের সামনে বিভিন্ন ধরনের আচারের বক্স সাজানো। আচার ভেদে এগুলার ভিন্ন ভিন্ন দাম।গৃহস্থালী থেকে শুরু করে আপনার নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল সামগ্রী এখানে পাওয়া যায়, দামেও তুলনামূলক সস্তা আছে।

আমরা আমাদের পচন্দ ও প্রয়োজনমত কিছু কেনাকাটা করলাম। মার্কেটের বেশিরভাগ জিনিস আসে বার্মা থেকে। কেনাকাটা শেষ করে একটা হোটেলে ঢুকে হালকা নাস্তা সেরে নিলাম।

বলে রাখা ভাল এখানে রাত্রি যাপন করার জন্য হোটেল,মোটেল এর অভাব নেই। প্রতি রাত জন প্রতি ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আছে। যে যার পচন্দ অনুযায়ী হোটেল বুক করবে। অনেক ভ্রমন পীপাসু আছে যারা রাতে বীচ এ তাবু করে রাত যাপন করে।

সময় গড়িয়ে রাত ৮ টা বাজে। আমাদের এবার যাওয়ার পালা। আনন্দের মুহুর্ত গুলো যেন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। রাত ১০ টায় আমাদের গাড়ি। সবাই ঢাকার উদ্দেশ্যে বাসে বসলাম।

এই কক্সবাজার ভ্রমনটা  ছিল আমাদের প্রথম ভ্রমনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। 

Post a Comment

2 Comments