প্রাকৃতিক নৈসর্গে মোড়ানো নেপালের বর্ডার টাউন কাকরভিটা


বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে ভারত হয়ে নেপালে এলে তিনটি দেশ দুইটি বর্ডার। প্রিয় বন্ধুরা স্বাগত জানাচ্ছি দক্ষিন পূর্ব নেপালের বর্ডার টাউন কাকরভিটায়। কাকরভিটার ইমিগ্রেশান অফিস আপনাকে দিবে নেপালি অবস্থানের প্রয়োজনীয় অনুমোদন। সড়ক পথে যারা নেপালে আসতে আগ্রহী তাদেরকে প্রথমে আসতে হবে বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার বুড়িমারি সীমান্তে,সীমান্ত পেরুলে ভারতের কুচবিহার জেলার চেংরাবান্ধা। চেংরাবান্ধা থেকে বাসে কিংবা ভাড়া করা গাড়িতে দুই ঘন্টায় শিলিগুড়ি, সেখান থেকে ১ ঘন্টায় দার্জিলিং এর বর্ডার টাউন রানীগঞ্জ। চেংরাবান্ধা দিয়ে শিলিগুড়ি বাইপাস দিয়ে আসা যায় রানীগঞ্জ। 

রানীগঞ্জের পানি ট্যাংকি সীমান্ত পেরুলে এপারে নেপালের কাকরভিটা। মানচিত্রে চোখ রাখলে কাকরভিটা নামের প্রান্তিক জনপদটিকে পাবেন নেপালের পূর্বের জেলা জাপায়। প্রায় ২৫ হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই কাকরভিটায় থাকার জন্য সুলভ মূল্যে হোটেল পাবেন অনেক। নেপাল যে চড়াই উতরায়এ ঠাসা পুরোপুরি পার্বত্য কোন  দেশ নয় সেটা আপনি টের পাবেন এই জাপায় এসে।

বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চল জুড়ে যেমন উপকূলীয় জনপদ, নেপালেরে দক্ষিন সীমানা জুড়েও তেমনি তরাই নামের সমতলীয় জনপদ। সমতল হলেও জাপা কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪১০ থেকে ১২৫০ ফুট উপরে। ১৬০৬ বর্গকিলোমাটার আয়তনের এই জনপদ বুকে ঠাঁই  দিয়েছে ৭ লাখেরও বেশি বাসিন্দা। সত্যিকারের পর্যটক যারা তারা শুধু নামকরা টুরিষ্টস্পটে ঘুরে বেড়ায় না,অনেকে পা রাখেন গ্রামে। খুঁজে বেড়ান গ্রামীন জীবনের স্নিগ্ধতা। স্নিগ্ধতায় বিড়ানো এই গ্রামের বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি উঠান আর প্রতিদিনের এই কর্মব্যস্ততা ৫০ বছর আগেও কিন্তু ছিল না। ছিল ঘন বন জঙ্গল আর ম্যালেরিয়ার প্রকোপ। 



পাহাড় থেকে আসা নানা জনগোষ্ঠি দিনে দিনে বদলে দিয়েছে বাস্তবতা। এককালের দুর্গম কালা পানিকে ওরা বানিয়েছে নিসর্গধন্য গ্রাম। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে নজর কাড়বে চমৎকার সব ফুল বাগান। এক বাগানে একসঙ্গে হরেক রকম ডালিয়া, যেন মেলা বসেছে রঙ্গের।  জীবিকা নিয়ে কথা  হল গ্রামের কয়েক জনের সাথে। গাঁয়ের মানুষ কেউ মজুরী করে, কেউ ব্যবসাপাতি আবার কেউ কৃষিকাজ। সমতলের গ্রাম তাই বেশিরভাগ বাড়ি দোতালা।

ভীমনগর গ্রামে আগে ছিল শুধুমাত্র রাজবংশীরা, এরপর একে একে এসেছে লিম্বু, রায়, মেচে, থিমাল, তামাল, বামন সহ নানা জাতিগোষ্ঠি। মিলেমিশে একসাথে আছে ওরা সবাই। ধান, পাট, গমের ফলন বেশি হওয়ায় জাপাকে সবাই বলে গ্র্যান্ড গ্রোসারী অব নেপাল। রাজবংশী ভাষায় জাপা মানে আচ্ছাদন। এককালে ঘন বনের আচ্ছাদনে ঢাকা ছিল তাই।

জাপা ছাড়িয়ে উত্তরে এলে স্বাগত জানায় বিখ্যাত ইলাম জনপদ। ইলামের ভূ-বৈচিত্র জাপার থেকে আলাদা। দূরে এক পাহাড় দেখা যায় এর দক্ষিনে জাপা জেলা এবং উত্তরে ইলাম জেলা। জাপায় ছিল সমতলের স্বস্তি আর ইলামে আকাশ ছোঁয়ার আনন্দ। মানে পাহাড় আর পাহাড়। এই আনন্দে ভাগ বসাতে আমরা এখন ইলামে। 

পৃথিবীর তৃতীয় পর্বত শিখর কাঞ্চনজঙ্ঘার পায়ের কাছে ইলামের পর্বতমালা আকাশ ছুঁয়েছে  ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার ফুট উঁচু হয়ে। স্থানীয় লিম্বু ভাষায় ই মানে পেছানো আর লাম মানে রাস্তা। ইলামের নামের স্বার্থকতা পাহাড়ের গায়ে এই আঁকাবাঁকা  রাস্তা দেখে বুঝা যাচ্ছে। জাপার মত সমতল ভূমি নেই ইলামে, পাহড় পর্বতের গায়ে ভাজে ভাজে তাই তো বিন্যাস্ত ধাপ জমি। এইসব ধাপ জমিনে জুমের ফসল ফলায় স্থানীরা।  ধাপ জমিনের মত ওরা মাথা গোজার ঠাঁই করেছে পাহাড়ের ভাজে।

১৭০৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ইলামে ৪৮ টি গ্রামগুচ্ছ ঠাঁই দিয়েছে প্রায় ৩ লাখ বাসিন্দাকে। ইলামের আবহাওয়ার কথা বলতে গেলে এখানকার আবহাওয়া সারাবছরই ভাল। তবে বেড়ানো মজা আর দেখার সুখ ফেব্রুয়ারী থেকে এপ্রিল আর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে। সমুদ্র সমতল থেকে পার্বত্য ইলামের উচ্চতা ৪৫৯ ফুট থেকে ১১৯২৯ ফুট পর্যন্ত। উচ্চতা যায় থাক কমবেশি সব পাহড়েই পাবেন পাহাড়িদের ঘর বসতি। এই বাড়ির বাসিন্দারা জাতিতে লিম্বু, নেপালের সাথে একিভূত হওয়ার আগে ১৮১৩ সাল পর্যন্ত লিম্বু শাসিত আলাদা রাজ্যই ছিল এই ইলাম।



এখন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির সহবস্থান এই ইলামে। লিম্বুই হোক কিংবা রায়, পাহাড়িরা কর্মীষ্ঠ খুব। দানাদার শস্য, শাকসবজি, জ্বালানিকাঠ সহ জীবন জীবিকার প্রয়োজনীয় রসদ প্রতিদিন ওরা প্রকৃতির কাছ থেকে আদায় করে দারুন কর্মনিষ্ঠায়। কখনো চড়াই কখনো উৎরাই, ইলামের পাহাড়ে পাহড়ে ঘুরলে দুটো লাভ। একটা পার্বত্য প্রকৃতির আপন ঐশ্বর্য তারউপর ভিন্ন ধারার জীবন বৈচিত্র পাহাড়ি এলাকা ত তাই এরা অবসর ফেলে লুড়ু খেলায় মেতে উঠে।

এখানকার একটা বড় ও জনপ্রিয় বিনোদন এই লুড়ু খেলা। ইলামের লোকজন আমদপ্রমোদ ত বটেই, মিশুকও খুব। চাইলে কোন বাড়িতে গেষ্ট হিসেবে একরাত থেকে আপনিও  উপভোগ করতে পারেন এদের জীবন ধারার মাধুর্য। আরও একটা মজার ব্যাপার হল আপনি ঘোড়ায় চেপে ইলাম দেখতে পারেন। এখানে ইলামগামী বাসও চলে। 

পথের মাঝে খাবার দোকান ফেলে ঢুঁ মারতে ভুলবেন না। দোকান গুলাতে মুখরোচক খাবার পাবেন গরম গরম। থাবা নামের এসব রেস্তোরায় আতিথ্য মেলে, ক্ষনিকের  বিশ্রামে পথচলার ক্লান্তি যেমন কাটবে পচন্দমত খাবার খেয়ে ক্ষুধা ও মিটবে।

যাচ্ছি এখন ইলামের মূল আকর্ষন টিভ্যালি তে। মাইলের পর মাইল টিভ্যালি সারা বছরই সবুজ। চোখ জুড়ানো চা বাগানের শ্যামলীমায়। চা বাগান নয় যেন সবুজ এর চাদর গায়ে দিছে টিভ্যালি। সে চাদরের আদর মাখতে মাখতে যাচ্ছি, দারুন লাগবে আপনাদেরও।

টিভ্যালির এইসব চা বাগান সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার ফুট উপরে। রজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও বৃটিশ কারিগরী সহায়তায় গড়ে উড়া এই বাগানগুলার চা বিশ্ববাজারে নন্দিত প্রায় ১৪০ বছর ধরে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে জনবিরল চা বাগানের আঁকাবাঁকা মেঠো পথে হাঁটলে হেঁটে বেড়ানোর মজা যেমন পাবেন ক্যামেরায় ছবি তোলার দারুন সব দৃশ্যপটও পাবেন। টিভ্যালির এসব চা বাগান দার্জিলিং এর চা বাগান থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে। ফলে একি আবহাওয়া একই পরিবেশে গড়ে উঠা এই টিভ্যালির চা স্বাদে ও গুনে দার্জিলিং চা এর সমতুল্য। 


টিভ্যালির টি প্রোসেসিং প্ল্যান্টটি চা বাগানের মাঝেই। এই বাগানের ২০০ হেক্টর যায়গা জুড়ে লাগানো চা গাছ প্রতি বছর যোগান দে প্রায় সোয়া লাখ কেজি চা পাতা। এখানকার প্রায় ৬ হাজার বাসিন্দার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পেশায় চা শ্রমিক। চা পাতা তুলতে ওরাও ছিড়ে দুটি পাতা একটি কুঁড়ি। চা পাতা তোলা কিন্তু সহজ কাছ নয়। শ্রম ও কৌশল লাগে। সুক্ষ এই কাজ মেয়েরা ভাল পারে বলে এই কাজ  মেয়েরাই করে। অফসিজনে দিনে কমপক্ষে ১৬ কেজি আর ভরা মৌসুমে সর্বচ্ছো ৬০ কেজি পর্যন্ত চা পাতা তুলে ওরা। বাগান থেকে চা পাতার তোলার এই কর্মযজ্ঞ দেখতে পাবেন এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। চা কে ওরা চিয়া বলে। বাগানে সকালে শুরু হওয়া পাতা সংগ্রহের কাজ শেষ হয় বিকালে।

জাপা আর ইলাম যেন এক বৃত্তে ফুটা ভিন্ন দুটি ফুল। দুই জনপদ দুই রকম। মিল শুধু এক যায়গায় বৈচিত্রে। প্রিয় বন্ধুরা ইলাম এবং জাপার মনমুগ্ধকর পরিবেশ মুগ্ধ করবে সবাইকে।


Post a Comment

0 Comments